বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

সুন্দর একটা স্বপ্ন

স্বপ্নে দেখলাম , একটা গুট্টু-গাট্টু মেয়ে আমাকে "বাবা-বাবা" বলে ডাকছে । আমি আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে ভোটকা-ভোটকা গালে চুমু দিচ্ছি , আমার মেয়ে ও আমাকে চুমু দিচ্ছে। এত টুকুন একটা মেয়ে , যে কি ধরনের সুন্দর ( আর কি পরিমান মোটা ) , কি বলবো !! কি মোটা মোটা হাত-পা , থপ থপ করে হাটে . টুক টুক করে হাটতে হাটতে আমার বুকের উপর এসে পড়ল , আহারে স্বপ্নটা যদি না ভাঙত , যদি অনন্তকাল পর্যন্ত দেখতে পারতাম ( আচ্ছা সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন গুলো এতো ছোট হয় কেন ?? )

অতীব দুঃখের বিষয় , স্বপ্নে মেয়ের মাকে দেখলাম না ( দেখার খুব ইচ্ছে ছিল )।

আমি আমার মেয়ের মতো সুন্দর কিছু এই পৃথিবীর জীবনে কোনদিন দেখিনি , দেখতে চাই ও না। আমি চাই ও আমার স্বপ্নে আবার আসুক , বারবার আসুক .

শুভ

( স্বপ্নটা ০৮-০২-২০০৭ এ দেখা , এত দিন বাংলা লিখতে জানতাম না , তাই লিখতে পারি নাই )

মেয়ের উদ্দেশ্যে ( আর কেউ যেন না পড়ে ... )
"মা রে , বাংলায় টাইপ করা যে কি পরিমান কষ্টের ব্যাপার , পৃথিবীতে আসলে টের পাবি। এই কষ্টের কাজটা করলাম , শুধু তোর জন্য। পারবি কোনদিন বাপরে এভাবে ভালবাসতে ?? পারবি কোনদিন ?? বল পারবি ?? "

আমার বাবা

বাবাকে নিয়ে লিখছি , কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না। আমার শুরুটা সবসময়ই খারাপ হয়।

আমি ছোটবেলায় খেলার সাথী হিসেবে বাবাকেই পেয়েছি। বড়লোক পরিবার খেকে আসিনি , দামী খেলনা কখনোই কিনতে পারতাম না। সস্তার মধ্যে পুতির গুলি-ওয়ালা পিস্তল কেনা যেত , কিন্তু ছোটবেলার থেকে গুলি-পিস্তল নিয়ে খেললে নাকি বাচ্চাদের মধ্যে ক্রাইম করার ঝোক তৈরি হয় , এজন্য কোনোদিন ওসব দিয়ে খেলাও হয়নি। আমি ক্রিকেট খেলতাম , আমি সবসময় ব্যাটিং করতাম , বাবা বোলিং করতেন । জীবনে কোনোদিন বাবাকে ব্যাটিং করতে দিয়েছি মনে পড়ে না .. ;) । বাবা খুব ভালো ক্যারম খেলতেন। বাবা আর একটা কাজ অবশ্য খুব ভালো করতেন , তা হল ক্যারম খেলার সময় গুটি চুরি করা। এই নিয়ে আমরা কত ঝগড়া করতাম , বাবা শুধু হাসত। বাবা আমার খেলাধুলা নিয়ে ও চেষ্টা কম করেননি , সেই কথা পরে একসময় বলব।

আমাকে নিয়ে বাবার হাজার স্বপ্ন। আমি কুলাঙ্গার পুত্র , তার একটা ও পূরন করতে পারিনি। স্বপ্ন নম্বর এক , তার ছেলে হবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি। ১লা বৈশাখ , ১লা ফাল্গুন এইদিন গুলোতে মাঝরাত থেকে রমনা বটমূলের সামনে গিয়ে বসে থাকবে , রবীন্দ্র-নজরুল এর জন্ম-মৃত্যু-বিবাহবার্ষিকী হুবুহু মনে রাখবে , টিভি ওয়ালারা বছরে দুই-একদিন রবীন্দ্র-নজরুল নিয়ে পাড়াপাড়ি শুরু করলে টিভির সামনে বুদ হয়ে পড়ে থাকবে , আরও কত কি !! আমার সুশীল সমাজ নিয়ে বিশেষ এ্যালার্জি থাকার কারনে সেইগুলি করা হয়ে ওঠেনি।

ছোটবেলায় বাবা খুব চেষ্টা করেছিলেন আমাকে "সুশীল" বানানোর জন্য। আমি যখন খুব ছোট , পড়তে ও শিখিনি , তখন আমাকে কোলে নিয়ে বাবা রবীন্দ্রনাথের "দুই বিঘা জমি" আবৃত্তি করতেন। মনে ক্ষীন অাশা , ছেলে যদি শুনে-শুনে ও একটু আবৃত্তি শেখে । লাভের মধ্যে লাভ হয়েছে , আমি "দুই বিঘা জমি" ঝাড়া মুখস্থ করে ফেললাম। এবং এমন সুরে আবৃত্তি করতে লাগলাম যে বাবা স্বীকার করলেন " ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ বেচে নেই , না হলে হয় নিজে মরে যেতেন , না হয় আমার ছেলেকে মেরে ফেলতেন "।

আমরা দুই ভাইবোন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বাংলা বাবার কাছেই পড়তাম। বাবার কাছেই শিখেছি যে লেখা পড়ার আগে লেখক পরিচিতি পড়তে হয় , যে মানুষটা এতো কষ্ট করে লেখাটা লিখল তাকে না জেনে শুধুমাত্র নম্বর পাওয়ার জন্য তার গদ্যটা ব্যবহার করা অন্যায়। আমি ইন্টারমিডিয়েটে বাংলায় এ- পেয়েছিলাম দেখে বাবা মনে যার পর নাই কষ্ট পেয়েছিলেন। আমি হয়ত কোনোদিন এক-আধটা স্কলারশিপ পেয়ে বাইরে চলে যাব , বিশেষ বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটলে হয়ত বড় এন্জিনিয়ার ও হয়ে যেতে পারি , তবে আমার বাংলায় এ- পাবার কষ্টটা বাবার চিরকালই থাকবে।

বাবা আমাদের ঐশ্বর্য দিতে পারেননি। ঐশ্বর্য তো খুবই দূরের কথা , বাংলায় "স্বচ্ছল পরিবার" বলতে যা বোঝায় আমরা ছিলাম তা থেকে ও কয়েক যোজন দূরে। বাবা যখন পেপারে ল্যাপটপ এর অ্যাড দেখে উচ্ছাসিত হয়ে বলেন "বাবা দেখতো , এই মডেল দিয়ে তোর হবে কিনা" , তখন আমি বাবার দিকে তাকিয়ে থাকি , উচ্ছাস দেখি। ওই বস্তু কিনে দেবার স্বামর্থ্য বাবার কোনোদিন ও হবে না জানি , কিন্তু তার বদলে যে অমূল্য রত্ন আমরা দুই ভাইবোন আমাদের জীবনে পেয়েছি , তা কি কম !!

মেয়েরা বাবার সাথে বেশী ঘনিস্ঠ থাকে , আমাদের পরিবার ও তার ব্যতিক্রম না। "বাবা , আমি তোমাকে ভালবাসি" , আমি জানিনা শতকরা কয়জন বাঙালী ছেলে এই কথা বলতে পারবে , আমি পারিনা। হয়ত বাবাকে আমি কোনোদিন ই এই কথা বলতে পারব না , কিন্তু ব্লগে তো লেখা যেতে পারে .......

বাবা আমি তোমাকে ভালবাসি।

বাবা আমি তোমাকে অনেক অনেক অনেক ভালবাসি।

ওদের জন্য কি সামান্য একটু ভালবাসা রাখা যায় না ?

সামনে ভ্যালেন্টাইন'স ডে , চারিদিকে ভালবাসার ছড়াছড়ি। তার উপর আবার পহেলা ফাল্গুন , বিশ্ব হিমু দিবস , বাঙালী সমাজে উৎসবের অামেজ।

ভালবাসার কথা বলার জন্য অনেক আছেন। অবশ্য বিরোধিতা করার জন্য ও কেউ কেউ আছেন , "কে বলসে ভ্যালেন্টাইন'স ডে খালি প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য রিজার্ভ করা , বাপ-মা , ভাই-বোন , বন্ধু-বান্ধব এর মধ্যে থাকবো না ক্যান " , এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক তো চলতেই থাকবে। আমি তাদের কথা বলছি না যারা ভ্যালেন্টাইন'স ডে মানেই শুধুমাত্র প্রেমিক-প্রেমিকাদের সম্পত্তি মনে করেন , তাদের ও না যারা এর মধ্যেও বাপ-মা নিয়ে আসছেন। তাদের কথা বলছি যারা ভালবাসতে পারেনা , যাদেরকে ভালবাসার অধিকার সমাজ , জাতি , ধর্ম সম্ভবত সৃষ্টিকর্তা নিজে ও দেন নি।

আমি তাদের কথা বলছি যারা আমাদের মাঝে থেকে ও আমাদের না। যাদের জন্ম হয়েছে ভদ্রলোকের ঘৃনা পাবার জন্য। তার প্রয়োজন ও অবশ্য আছে , ভালবাসা ছড়ানোর এত্তো-এত্তো জায়গা আছে , ঘৃনাগুলো রাখার জন্য ও তো কেউ না কেউ থাকা লাগবে। সমাজ , জাতি , ধর্ম এমনকি উপরওয়ালা পর্যন্ত তাদের আলাদা করে রেখেছেন ভোগ করার জন্য , ছুড়ে ফেলে দেবার জন্য , গালি দিয়ে সুখ মেটানোর জন্য। তাদের কথা বলছি , পতিতাদের কথা।

একটি মেয়ে , কতটা কষ্ট নিয়ে , ছোট্ট একটা বুকে কতখানি জ্বালা নিয়ে শরীর বেচতে নামে তা হয়ত আমরা ভদ্রলোকেরা কল্পনা ও করতে পারব না। একমুঠো ভাতের জন্য। হয়ত নিজের জন্য ও না , নিজের জীবনের জন্য মানুষ এতকিছু করে না , বুড়িগঙ্গার উপর থেকে ঝাপ দিয়ে পড়লেই কি , কিন্তু বাড়ির লোকগুলি ?? বাড়িতে হয়ত সন্তান অাছে , ছোট-ছোট ভাইবোন আছে , মা আছে , তাদের জন্য। হয়ত অাজকে রাতে চুলা জ্বলবে না টাকার ব্যাবস্থা না করতে পারলে , বাচ্চাটা দুধের জন্য কাদছে , ছোট ভাইবোন গুলি পরীক্ষা দিতে পারছে না ফি না দিতে পারার জন্য , কত চিন্তা। একদিন হয়ত বাচ্চাটা বড় হবে , লেখাপড়া শিখবে , কোনো দিন পরিচয় দিতে ও লজ্জা পাবে "উনি আমার মা" বলে। ভাইবোন গুলি "মানুষ" হবে , তার ই মতো একজন "মানুষ" বিয়ে করে সংসারী হবে , বেমালুম ভুলে যাবে একজন অমানুষের রক্ত পানি করা টাকায় সে বড় হয়েছে , লজ্জা পাবে এই কথা মনে করে যে একজন দেহপসারিনীর নষ্ট রক্তের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক আছে।

মানুষ পৃথিবীর পাপের জন্য পরকালে শাস্তি পাবে। আমার জানতে বড় ইচ্ছা করে এরা আগের জীবনে এমন কি পাপ করেছে যার জন্য এই জীবনে এতো কষ্ট পাচ্ছে। আপনারা যারা পুর্নজন্মে বিশ্বাস করেন না , তারা এটাতো মানেন যে প্রত্যেক নবজাতক নিষ্পাপ অবস্থায় পৃথিবীতে আসে। তাহলে তারা ঠিক জন্ম নেবার মুহুর্তে এমন কি পাপ করে যার জন্য তাকে সারাজীবন এই নরকের জীবন বহন করতে হয়।

ব্যাভিচারী নরকে যাবে , কে না জানে ! একটা মেয়ে লেখাপড়া জানেনা , বাবা অর্থ-সম্পত্তি রেখে দিয়ে যাননি , কারিগরি শিক্ষা ও নেই। আছে শুধু শরীরটা। মাথার উপর ছাদ নেই , দুদিন ধরে না খাওয়া , দুধের বাচ্চাটা না খেতে পেরে চোখের সামনে মারা যাচ্ছে , সে এমন অবস্থায় কি করবে ? সে আর কি করতে পারে ? আমি এর উত্তর জানিনা , সম্ভবত সৃষ্টিকর্তা জানেন। আমার খুব ইচ্ছে যেদিন সৃষ্টিকর্তার সামনে গিয়ে দাড়াব সেদিন এই একটা প্রশ্ন করার। আমি হয়ত সরাসরি দোযখে যাব , এই ঔদ্ধৃর্তপূর্ন প্রশ্ন করলে শাস্তির সময়সীমা হয়ত আরো কয়েকশ বছর বাড়বে , তারপর ও করব।

অনেকে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি দেখেন। ক্ষুধার তো আর বাংলাদেশ-আমেরিকা নেই। ক্যামেরার সামনে যে মেয়েটা ধীরে ধীরে কাপড় খুলছে ,হাসি মুখে নিজের "দর্শক-শ্রোতাদের" খুশি করার প্রানান্ত চেষ্টা করছে , তার ভেতরের কষ্টের কথাটা কয়জন চিন্তা করে জানিনা , আমি কখোনো করিনি। বাড়িতে লোকগুলি পথ চেয়ে আছে , কয়েকটা "ডলার" যোগাড় করা খুব জরুরি। কোটি কোটি মানুষের সামনে সম্ভ্রম বিক্রি করে দিয়ে গেল কয়েকটা ডলারের জন্য , ইশ্ কি জীবন !!

আমি একটা ফুটফুটে মেয়ের স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি , আমি ওকে বুকে নিয়ে ঘুরছি , পরম আদর-ভালবাসা নিয়ে বড় করছি। সব বাবা-মা ই হয়ত এই স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তাদের মধ্যে ও তো অনেকে নির্মম বাস্তবতার স্বীকার হয়ে সমাজে পতিত হয়। আমার মেয়েটা ও যদি কোনো একদিন ... নাহ্ আর পারছি না।

আমি মহাপুরুষ নই। ব্লগে এসে মহাপুরুষ তৈরি করা ও আমার লক্ষ্য না। আমি শুধু
বলতে চাই , আচ্ছা আমরা ভালবাসা দিবসে একদিনের জন্য কি ওদেরকে
"পতিতা" হিসেবে না দেখে "মানুষ" হিসেবে দেখতে পারিনা ? সামান্য একটু ও
ভালবাসা দিতে পারিনা , মাত্র একদিনের জন্য ?